যুদ্ধ নাকি সংলাপ : কোন পথে আমেরিকা-ইরান সম্পর্ক!॥শামীম আল আমিন

অথর
নিজস্ব প্রতিবেদক   বাংলাদেশ
প্রকাশিত :২৪ জুলাই ২০১৯, ১০:২২ পূর্বাহ্ণ | নিউজটি পড়া হয়েছে : 132 বার
যুদ্ধ নাকি সংলাপ : কোন পথে আমেরিকা-ইরান সম্পর্ক!॥শামীম আল আমিন

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় খুব অল্প কিছু উদাহরণ বাদ দিলে ইরানের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক খুব একটা ভালো ছিল না। ইরানের মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভির আমলটা অবশ্য বেশ ভালোই কেটেছে আমেরিকা ও তার মিত্রদের।

এরপর দিনে দিনে বিভিন্ন বাঁক ঘুরে ছয় জাতির চুক্তির মাধ্যমে গত কয়েক বছর আগেও একধরনের স্থিতাবস্থা ছিল যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে এই সম্পর্কটা বলা চলে খুবই খারাপের দিকেই মোড় নিয়েছে। পরিস্থিতি এমন যে এই আলোচনাও শুরু হয়েছে, তাহলে কি এই ধরিত্রীকে আরো একটি বড় যুদ্ধ দেখতে হবে?
এ মুহূর্তে বলা চলে একেবারে মুখোমুখি অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান। যুদ্ধ বেধে যেতে যেতে হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অনুমোদন দেওয়ার পরও ইরানে হামলা চালানোর মাত্র ১০ মিনিট আগে তা স্থগিত করেন। এর আগে আকাশসীমা লঙ্ঘনের অভিযোগে আমেরিকার একটি ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করে ইরান। ট্রাম্প বলছেন, ‘ড্রোন ভূপাতিত করে ইরান বড় ভুল করেছে। ’ জবাবে ইরানের জেনারেল বলছেন, ‘ইরানে গোলা পড়লে ছেড়ে কথা বলা হবে না। ’ এমন পাল্টাপাল্টি অবস্থানে পৃথিবীতে দেখা দিয়েছে নতুন এক অস্থিরতা।একটু পেছনে ফিরে তাকানো যাক। ২০০০ সালের দিকের কথা। আমেরিকা অভিযোগ তোলে, ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এর দুই বছর পরে তখনকার প্রেসিডেন্ট জজ ডাব্লিউ বুশ ইরান, ইরাক ও উত্তর কোরিয়াকে ‘শয়তানের অক্ষ’ বলে আখ্যা দেন। ওই বছরই বুশ প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে।

২০০৭ সালের মে মাসে তখনকার আমেরিকার সেক্রেটারি অব স্টেট কন্ডোলিৎসা রাইস ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মানুচের মোত্তাকি মিসরে এক সম্মেলনে যোগ দিয়ে নিজেদের মধ্যে একটি আলোচনার সূত্রপাত করেন। পরের বছর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ প্রথমবারের মতো সরাসরি আলোচনায় বসতে ইরানের প্রতি আনুষ্ঠানিক বার্তা পাঠান। সেই ধারাবাহিকতায় পরের বছর প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনার হাত বাড়ানো থাকবে, যদি তেহরান পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করে। ২০১৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন বারাক ওবামা। বিগত তিন দশকের মধ্যে দুই দেশের শীর্ষনেতাদের মধ্যে সেটাই ছিল সরাসরি কথা বলার ঘটনা। এরপর পর্যায়ক্রমে ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের ছয় দেশ একটি চুক্তিতে পৌঁছায়।

তবে ক্ষমতায় এসে সব কিছু উল্টে দেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি নির্বাচনী প্রচারণাতেই বলেছিলেন, প্রেসিডেন্ট হলে ইরানের সঙ্গে করা চুক্তিটি বাতিল করবেন। ২০১৮ সালের মে মাসে একতরফাভাবে সেই চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ট্রাম্প প্রশাসন।

প্রতিক্রিয়ায় ইরানও বসে থাকেনি। নতুন করে নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি শুরু করার ঘোষণা দেয় তারা। সঙ্গে এ ঘোষণাও দেয়, তাদের ওপর অবরোধ আরোপ থেকে পশ্চিমা দেশগুলো ওয়াশিংটনকে বিরত রাখতে পারলে তেহরান বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক শক্তি বাড়াতে থাকেন। এর মধ্যে গত মে ও জুন মাসে উপসাগরীয় অঞ্চলে ছয়টি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ইরানকে দায়ী করে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও তেহরান সব সময় এই অভিযোগ নাকচ করে আসছে। বিষয়টি নিয়ে কথার লড়াই চলতে থাকে দুই পক্ষের মধ্যে।

এমন পরিস্থিতিতে তাহলে কি যুদ্ধ আসন্ন? পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ঘটনাগুলো যতটা দ্রুতগতিতে গড়াচ্ছে, তাতে সামান্য কোনো উসকানি থেকে বড় ধরনের যুদ্ধ বেধে যেতেই পারে। আর এই উসকানি শুধু ইরানের কাছ থেকে নয়, এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশ থেকেও আসতে পারে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা যেকোনো সময় যুদ্ধে রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করেছে পরাশক্তি ফ্রান্স। ইরানের সঙ্গে হওয়া ছয় জাতি চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বের হয়ে যাওয়া এবং ওয়াশিংটনের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় তেহরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সিদ্ধান্তে এমন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-ইভ লু দ্রিয়ঁ।

যদিও যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় মিত্ররা জানিয়ে দিয়েছে, এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি যে এখনই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেতে হবে। সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রধান ফেদেরিকো মঘেরিনি যেকোনো মূল্যে সামরিক সংঘর্ষ এড়ানোর জন্য আমেরিকার সেক্রেটারি অব স্টেট মাইক পম্পেওকে পরামর্শ দিয়েছেন। যদিও সম্প্রতি জিব্রাল্টারে ইরানের জাহাজ আটকের ঘটনায় আমেরিকার আরেক বন্ধু যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ইরানের টানাপড়েন নতুন মাত্রা পেয়েছে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতি গ্রহণ করেছেন বলেই মনে করা হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তে ইরানও শক্ত প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করেছে, বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞার পরিপ্রেক্ষিতে তেহরানের তেল রপ্তানিতে প্রভাব পড়ায়।

তাহলে কি সংলাপের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের কোনো সম্ভাবনাই নেই? যুক্তরাষ্ট্রের কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড এন হাস তাঁর একটি লেখায় উল্লেখ করেছেন, ‘এ ধরনের আলোচনার সময় এখন হয়েছে। সংশোধিত একটি চুক্তির মাধ্যমে ইরানের পরমাণু তৎপরতাকে সংযত রাখার পাশাপাশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে হয়তো নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে। এর বিনিময়ে ইরানের ওপর থেকে অনেক নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবে। সংশোধিত চুক্তি হয়তো ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ককে স্বাভাবিক করবে না। তবে এটি যুদ্ধের এবং ইরানের পরমাণু শক্তিধর হয়ে ওঠার আশঙ্কাকে নাটকীয়ভাবে হ্রাস করবে। ’

২০২০ সালের নির্বাচনের আগে কোনো বড় যুদ্ধে প্রেসিডেন্ট জড়াবেন বলে মনে করেন না অনেকেই। আবার যুদ্ধের জন্য কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এ নিয়ে আমেরিকার কংগ্রেসের সম্মতি নিতে হবে—এমন দাবি তুলেছেন দেশটির রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক উভয় দলের নেতারাই। ফলে যুদ্ধ নিয়ে দেশের ভেতরেই একধরনের বড় আপত্তি রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

সব পক্ষই বলছে, কেউই যুদ্ধ চায় না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি কিংবা উপসাগরীয় অঞ্চলের নেতাদেরও একই কথা। যুদ্ধ চায় না পৃথিবীর শান্তিপ্রিয় মানুষ। বিশ্লেষকরা বলছেন, এর পরও উত্তেজনাকর যেসব উপাদানের উপস্থিতি রয়েছে, তা আশঙ্কাজনক। আর এই আশঙ্কা মোকাবেলা করে দুই পক্ষের মধ্যে আপাত স্থিতিশীল অবস্থা ফিরিয়ে আনাই এ মুহূর্তের প্রধান চ্যালেঞ্জ

সংবাদটি শেয়ার করুনঃ
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *