সতর্ক হোন, ফাঁদে পা দেবেন না :শামীম আল আমিন

অথর
নিজস্ব প্রতিবেদক   বাংলাদেশ
প্রকাশিত :৩০ আগস্ট ২০১৯, ৩:৫৭ পূর্বাহ্ণ | নিউজটি পড়া হয়েছে : 351 বার
সতর্ক হোন, ফাঁদে পা দেবেন না :শামীম আল আমিন

তারুণ্যের ঝলকানি দেখিয়ে যখন আমেরিকার মতো উন্নত এবং সুষম সুযোগের দেশে একজন তরুণের সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার কথা, তখন তার বিরুদ্ধে ভয়াবহ কোনো অপরাধের অভিযোগ উঠলে সেটা কি মানায়! অথচ এমনটাই ঘটছে একের পর এক। বিশেষ করে বাংলাদেশি আমেরিকানদের মধ্যে এ ধরনের ঘটনায় দেখা দিয়েছে গভীর শঙ্কা ও উদ্বেগ।

বিশ্বজুড়েই বিপজ্জনক জঙ্গিবাদের যে উত্থান, তার প্রভাব এসে পড়ছে আমেরিকায় জন্ম নেওয়া ও বেড়ে ওঠা তরুণদের মধ্যেও। যে কারণে ‘স্টিং অপারেশন’ নামে একটি বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে ফাঁদ পেতে গোয়েন্দারা সেসব তরুণকে আটক করার কাজটি করে যাচ্ছে। শুধু তরুণ নয়, মনের ভেতরে জঙ্গিবাদকে লালন করে, ভবিষ্যতে সুযোগ পেলে কোনো একটি ভয়াবহ অপরাধে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে চায়—এ ধরনের সব বয়সী ব্যক্তিকে ধরার কাজটি করা হয় স্টিং অপারেশনের মাধ্যমে। তবে এই কার্যক্রমের জালে বেশির ভাগ সময়ই তরুণদের ধরা পড়তে দেখা যায়।

স্টিং অপারেশনের মাধ্যমে দীর্ঘ সময়ের ফাঁদ পেতে জঙ্গিবাদকে মনের ভেতরে লালন করে এমন অপরাধী ধরা হয়। এ ক্ষেত্রে বেছে নেওয়া হয় যাদের মনের ভেতরে সুপ্ত অবস্থায় জঙ্গিবাদের বীজ রয়েছে বলে সন্দেহ করা হয়, তাদেরকে। আর গোটা বিষয়টি বের করে নিয়ে আসার জন্য গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের এজেন্টটা ছদ্মবেশে দীর্ঘ সময় সম্ভাব্য অপরাধীর পেছনে লেগে থাকে। তার সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে, বিপুল অর্থও খরচ করে। প্রয়োজনে এফবিআইয়ের তথ্যদাতারা নিজেদের সন্ত্রাসী সংগঠনের লোক বলেও পরিচয় দেয়।

আমেরিকার বিরুদ্ধে মনের গভীরে থাকা কোনো ক্ষোভ কিংবা উগ্র ভাবনাকে বাস্তব করার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য অপরাধীর সহযোগী হয়ে ওঠে গোয়েন্দারা। একপর্যায়ে পরিকল্পনা যখন চূড়ান্ত। তার বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদের যথেষ্ট প্রমাণ যখন গোয়েন্দাদের হাতে, তখনই জাল পেতে তাকে আটক করা হয়।
যদিও এ ধরনের অভিযোগের তদন্তটি নিরপেক্ষভাবে দুদিক থেকেই হওয়া প্রয়োজন বলে মানবাধিকার কর্মীদের মতামত। আবার অনেকে বলছেন, সামান্য কোনো কারণে একজন বিভ্রান্ত হওয়া তরুণকে আরো বিভ্রান্তির দিকে ঠেলে দিয়ে আটক করা ঠিক নয়। বরং তার প্রতি নজর রেখে, সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনার কৌশল নেওয়ার কথা বলছেন অনেকে। পাশাপাশি জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারণা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানোর পরামর্শও দিয়েছেন অনেকে। জঙ্গিবাদ যে ভয়াবহ একটি খারাপ বিষয়, এটি যেকোনো সমাজ কিংবা ধর্মেই গ্রহণযোগ্য নয়, এর মধ্য দিয়ে যে মানবতার বিপর্যয় ঘটছে, এগুলো সেসব মানুষকে বোঝাতে হবে, যারা ভুল চিন্তা করছে।
জঙ্গি দমনে আমেরিকায় যে এভাবে ফাঁদ পাতা হচ্ছে, তার পেছনে প্রশাসনের যুক্তি হচ্ছে, পুরোটাই দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে। বিশেষ করে, দেশের ভেতরে নীরবে যেসব জঙ্গি গড়ে উঠছে, তাদের প্রতিহত করাই এই কার্যক্রমের লক্ষ্য। এটির উদ্দেশ্য দেশকে নিরাপদ রাখা। আর অবশ্যই একটি দেশ নিজেদের নিরাপদ রাখার যাবতীয় নীতি ও কৌশল নিতেই পারে। তারা সেটা কোন কৌশলে করবে, সেটাও নিজেদের মতো করে ঠিক করবে। কোন সময় কোন কৌশল কাজে দেবে, সেটাও তাদের ঠিক করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। কখনো কোনো কৌশল কাজে না দিলে, তারা সেটা বদলেও ফেলতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, যা গোটা মানবতার ক্ষতি সাধন করে, সেই জঙ্গিবাদকে আপনি কেন মনের ভেতরে লালন করবেন? চারপাশে হাজারো ফাঁদ পাতা থাকুক। আপনি কেন সেই ফাঁদে পা দেবেন? ধর্মান্ধতার বলি আপনি কেন হবেন? ফলে এ ক্ষেত্রেও সতর্ক এবং সাবধান হওয়ার দরকার রয়েছে।
আমেরিকায় বেড়ে ওঠা ভুল চিন্তা করা তরুণদের কথা ভাবলে অদ্ভুত লাগে। যে বয়সে তাদের লেখাপড়া করার কথা, নিজেদের তৈরি করে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার কথা; সেই বয়সে তারা উদ্ভট চিন্তা করছে, ফাঁদে পা দিচ্ছে! পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে জ্ঞান-বিজ্ঞানে আমেরিকা অনেক এগিয়ে। তরুণদের সামনে অবারিত ভবিষ্যৎ এই দেশে। জঙ্গিবাদের মতো ভয়াবহ এবং খারাপ চিন্তা যেন তাই মাথার ভেতরেই না আসে। তরুণদের ভাবতে হবে নিজের কথা; পরিবার ও দেশের উন্নয়নের কথা। যারা আমেরিকায় থাকেন, তাঁদের মনে রাখতে হবে, এটি আপনার দেশ। এই দেশ আপনাকে দিয়েছে অবারিত সুযোগ। এই দেশকে বরং নিরাপদ রাখার কথা ভাবতে হবে আপনাকে।
জঙ্গিবাদে জড়িত থাকার অভিযোগে ইদানীং আমেরিকায় একের পর এক বাংলাদেশি গ্রেপ্তার হচ্ছেন। বেশ কয়েকটি ঘটনা এরই মধ্যে ঘটে গেছে। আদালতে মামলা হচ্ছে জঙ্গিসংক্রান্ত আইনে। সাজাও হচ্ছে। সবচেয়ে সাম্প্রতিক ঘটনাটি ঘটেছে ২৬ জুলাই, শুক্রবার। নিউ ইয়র্কের ব্রঙ্কসে বসবাসরত বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী আমেরিকান নাগরিক দেলোয়ার মোহাম্মদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই। দেলোয়ারের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি আফগানিস্তানে গিয়ে তালেবানদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আমেরিকান সৈন্যদের হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন। ভয়াবহ অভিযোগ! দেলোয়ার হোসেন আফগানিস্তানে যাওয়ার জন্য ব্যাংককগামী ফ্লাইট ধরতে জেএফকে বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছিলেন। সেখান থেকে তাকে উঠিয়ে নেয় এফবিআই। ওই দিনই বিকেলে ম্যানহাটন আদালতে তোলা হয় ৩৩ বছর বয়সী ওই ব্যক্তিকে। এখানেই শেষ নয়, মাসখানেক আগে জঙ্গিবাদী চিন্তা ও হামলা পরিকল্পনার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন আশিকুল আলম নামে ২২ বছরের এক ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া শিক্ষার্থী। সম্প্রতি নিউ ইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস থেকে আটক আশিকুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি টাইমস স্কয়ারে হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন। ওই তরুণের সঙ্গে এফবিআইয়ের তথ্যদাতা বন্ধুত্ব পাতিয়েছিলেন, যাকে তিনি হামলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। এর আগে আকায়েদ উল্লাহ ও নাফিসসহ আরো কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছিল এফবিআই। আর এসব ক্ষেত্রে আটককৃতদের পরিচয় আমেরিকার প্রধান গণমাধ্যমগুলোতে বাংলাদেশি আমেরিকান বলা হচ্ছে। আর এ নিয়ে বাংলাদেশি আমেরিকানদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চাপা অস্বস্তি। আছে শঙ্কাও। অনেকের মনে প্রশ্ন, এরপর কে?

অথচ গোটা বিষয়টি নিয়ে আমেরিকার বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে বড় ধরনের কোনো কার্যক্রম নেই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের শাখাসহ শত শত সংগঠন এখানে গড়ে তুলেছেন প্রবাসীরা। রয়েছে অসংখ্য মসজিদও। কিন্তু কার্যকর অর্থে জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রম, সচেতনতামূলক কর্মসূচি চোখে পড়ে না বললেই চলে। এ ছাড়া বাড়িতে ছেলে-মেয়েরা কী করছে, তারা কী নিয়ে ভাবে, কোথায় যাচ্ছে—এসব নিয়ে কিছু মা-বাবা সচেতন নন। বিষয়টি উদ্বেগের।

কিছুদিন আগে ব্রঙ্কসে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে একটি মতবিনিময় সভায় অংশ নিয়েছিলেন নিউ ইয়র্কের পুলিশ কমিশনার জেমস ও’নিল। তাঁকে কাছে পেয়ে প্রবাসীরা প্রশ্ন করেছিলেন স্টিং অপারেশন নিয়ে। জবাবে পুলিশ কমিশনার জানিয়েছিলেন, যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই অপরাধীকে ধরা হয়। জঙ্গি মনোভাব দমনে তিনি বিশেষভাবে মা-বাবার সচেতনতার ওপর জোর দিয়েছিলেন সেদিন।

ফলে আমরা যদি সচেতন থাকি, সতর্ক হই তাহলে হয়তো এমন অভিযোগ নিয়ে নতুন কাউকে আর আটক হতে দেখব না। একই সঙ্গে এসব ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিটাও জানিয়ে রেখেছেন অনেকে। তবে আমার কথা, ভুলটি যেন আমাদের দিক থেকে না হয়। আমরা যেন আমাদের সন্তানদের সেটা বোঝাতে সমর্থ হই। প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের প্রতি কর্তব্য যেমন ভুলে যাব না; তেমনি আমেরিকায় থেকে এই দেশটিকেও যেন ভালোবাসি। দেশের প্রতি দায়িত্ব পালন করি, সম্মান করি। নিজেকে বিচ্ছিন্ন না ভেবে, যেন মূল স্রোতে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে আগামীর সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যাই। আমাদের সামনে তাকাতে হবে। আর ভুলে গেলে চলবে না, আমেরিকায় আমাদের কারো কোনো অপরাধে বাংলাদেশের নামটিও সামনে চলে আসে। এটা কতটা লজ্জার ভাবতে পারেন! আমরা যেন এমন সব কাজ করি, যাতে বাংলাদেশের মুখটা বিশ্বজোড়া উজ্জ্বল হয়। চাণক্যের একটি শ্লোক এ ক্ষেত্রে মনে করিয়ে দিতে চাই। তিনি বলেছিলেন, ‘একটি কুবৃক্ষের কোটরের আগুন থেকে সমস্ত বন ভস্মীভূত হয়। ’ আমরা তো সেটা হতে দিতে পারি না।

লেখক : কালের কণ্ঠ’র উত্তর আমেরিকার

সংবাদটি শেয়ার করুনঃ
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *